ভারতে অসম জনবন্টনের কারণগুলি ব্যাখ্যা করো

অনুরূপ প্রশ্ন- ভারতের জনঘনত্বের তারতম্যের কারণগুলি আলোচনা করো-
ভারতের জনবসতি ঘনত্ব সর্বত্র সমান নয় কেন?

জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল দেশ। ভারতের জনসংখ্যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল অসম বন্টন। দেখা গেছে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় 50% (প্রায় ৫১ কোটি) বাস করে সমভূমিতে (মোট ভূমির প্রায় 23%)। হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে জনসংখ্যার বন্ধন যেমন কম, মালভূমি অঞ্চলে মাঝারি। জনসংখ্যা বন্টনের কারণগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

প্রাকৃতিক কারণঅর্থনৈতিক কারণসামাজিক কারণঅন্যান্য কারণ
1) ভূ-প্রকৃতি8) শিল্প11) নগরায়ন14) ধর্মীয় স্থান
2) নদ-নদী9) কৃষি ও পশুপালন12) শিক্ষা কেন্দ্র15) ঐতিহাসিক স্থান
3) জলবায়ু10) যোগাযোগ ব্যবস্থা13) সরকারি নীতি16) পর্যটন ব্যবস্থা
4) মৃত্তিকা17) অনুপ্রবেশ
5) ভৌম জল
6) বনভূমি
7) খনিজ সম্পদ

1) ভূপ্রকৃতি:

ভূ প্রকৃতি জনসংখ্যা বন্টনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। ভূমির উচ্চতা, ঢাল, বন্ধুরতা, জলমগ্ন জলাভূমি প্রবৃত্তি উপাদানের উপর ভিত্তি করে জনবসতি গড়ে ওঠে।
সমভূমি অঞ্চল সমতল হওয়ায় কৃষি, যোগাযোগ ও শিল্পে উন্নত। তাই জনঘনত্ব খুব বেশি।
কি মনে পার্বত্য অঞ্চল উঁচু, বন্ধুর এবং ঢাল বেশি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্প প্রভৃতি তেমনভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। আবার দার্জিলিং, গ্যাংটক, সিমলা, মুসৌরি প্রভৃতি স্থানে প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক বিশ্বের কারণে পর্যটন শিল্পে উন্নত হওয়ায় জনসংখ্যা বেশি।
মালভূমি অঞ্চলে ভূমির ঢাল ও উচ্চতা মধ্যম প্রকার। ফলে জনসংখ্যার ঘনত্ব মাঝারি।

2) নদ নদী:

প্রাচীনকাল থেকেই নদী হল সভ্যতার পত্তনকেন্দ্র। কারণ নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলি জলসেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পানীয় জলের যোগান, পূর্ব ওর মৃত্তিকায় কৃষি, শিল্প প্রভৃতি বিভিন্ন দিক থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে।

এই কারণে ভারতের সিন্ধু, গঙ্গা, বহ্মপুত্র গোদাবরী কৃষ্ণা কাবেরী নর্মদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল ঘনবসতিপূর্ণ।

3) জলবায়ু:

ভারতের যেসব অঞ্চলে অনুকূল জলবায়ু অর্থাৎ উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাত দুটোই কৃষি উপযোগী সেসব অঞ্চলে ঘন-জনবসতি গড়ে উঠেছে।

যেমন- কেরালা, তামিলনাড়ু ও গাঙ্গে উপত্যকায় অবস্থিত রাজ্যগুলিতে জনবসতি বেশি। অপরদিকে চরম জলবায়ু অর্থাৎ প্রচন্ড উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের অভাবে রাজস্থানের মরু অঞ্চলে ঘনত্ব খুবই কম।
আবার উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে অত্যধিক শীতলতার জন্য জনবসতি বিরল।

জলবায়ুর প্রধান উপাদান বৃষ্টিপাত জনসংখ্যার বন্টনকে সবথেকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বলা হয়- The population map of India follows the rainfall map.

4) মৃত্তিকা:

মাটির গুনাগুনের উপর জনবসতির ঘনত্ব নির্ভর করে। উর্বর পলি মাটি কৃষি কাজের পক্ষে বিশেষ উপযোগী হওয়ায় উর্বর পলিমাটি যুক্ত পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, উত্তর প্রদেশ, অসম এবং উর্বর কালোমাটি যুক্ত গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্য জনবসতি দেখা যায়। অন্যদিকে অনুর্বর মাটিতে গঠিত মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান প্রভৃতি রাজ্য জনবসতির ঘনত্ব কম।

5) ভৌম-জল:

একটি জনবসতি গড়ে ওঠার জন্য অবশ্যই সেই অঞ্চলে ভৌম জলের পর্যাপ্ত যোগান প্রয়োজন।
যেমন- রাজস্থানের মরুভূমি অঞ্চল গুলিতে ভৌম জল স্তর না থাকার জন্য জনবসতি গড়ে ওঠেনি।

6) বনভূমি:

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, উত্তর পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল, পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢাল, দক্ষিণাত্যের পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে গভীর বনভূমি তৈরি হয়েছে। যদিও বনভূমি থেকে প্রচুর অরণ্য সম্পদ পাওয়া যায় তবুও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতা ও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ স্বল্প থাকার দরুন এই অঞ্চলগুলিতে জনবসতি কম।

7) খনিজ সম্পদ:

খনিজ উত্তোলক অঞ্চলে কাজের সুবিধা থাকায় জনবসতি গড়ে ওঠে।
ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল ভারতের খনিজ ভান্ডার তাই এখানে জনঘনত্ব অধিক।

8) শিল্প ও শিল্পাঞ্চল:

শিল্পের উন্নতিতে কাজের সুযোগ বাড়ে। ফোনে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত লোকজন শিল্পাঞ্চলে বসবাস শুরু করে। তাই শিল্পাঞ্চল গুলিতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক।
যেমন- হুগলি নদীর উভয় তীর, জামশেদপুর, দুর্গাপুর, মুম্বাই, গুজরাট এই কারণের জন্য জনবসতিপূর্ণ।

9) কৃষি ও পশুপালন:

ভারতের গ্রামীণ জনসংখ্যা (72.22%) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল।

উর্বর মৃত্তিকা ও সমতল ভূমিভাগের কারণে গাঙ্গেয় সমভূমি ও উপকূল ভাগ অধিক জনবসতিপূর্ণ। নিবিড় পদ্ধতিতে এইসব অঞ্চল গুলিতে বছরে তিন-চারবার ফসল উৎপাদন করা হয়।

10) যোগাযোগ ব্যবস্থা:

যোগাযোগ ব্যবস্থা কোন অঞ্চলের উন্নতির প্রধান শর্ত। সুতরাং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার (সড়কপথ, রেলপথ, বিমানপথ ও জলপথ) ফলে কোন অঞ্চলের জনঘনত্ব বৃদ্ধি পায়।
উদাহরণ হিসাবে বলা যায়- ছয়টি প্রধান শহর- কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর এবং হায়দ্রাবাদের কথা।

11) নগরায়ন:

নগরায়নের প্রভাবে জনসংখ্যার ঘনত্ব ক্রমশ বাড়ছে। তাই কলকাতা, মুম্বাই-এর জনঘনত্ব 6000 জন/ কিমি।

12) শিক্ষা কেন্দ্র:

শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে দেশ-বিদেশ থেকে শিক্ষার্থী আছে বলে ওই অঞ্চলগুলিতে জনবসতি গড়ে ওঠে।
যেমন- শান্তিনিকেতন, বারানসী।

13) ধর্মীয় স্থান:

ভারতের ধর্মীয় স্থানগুলিতে সারাদেশ থেকে লোকজনেরা এসে বাস করে। দোকান, বাজার, সরাইখানা, হোটেল গড়ে ওঠে এবং বসতি বাড়তে থাকে। যেমন- পুরী, হরিদ্দার, বারাণসী, বৃন্দাবন প্রভৃতি।

14) ঐতিহাসিক স্থান:

ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান গুলি যেমন- দিল্লি, আগ্রা, জয়পুর, হায়দ্রাবাদ, ইত্যাদি স্থানে বিভিন্ন স্থাপত্য ভাস্কর্য শিল্পের নির্দেশন থাকায় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

15) রাজনৈতিক কারণ:

দেশের প্রতিটি রাজ্যে রাজধানীতে এবং দিল্লিতে প্রশাসনিক কাজে জন্য প্রচুর অফিস আদালত প্রভৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রচুর মানুষকে সেই সকল স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হয়। তাই রাজ্যের রাজধানী গুলিতে জনঘনত্ব বেশি।

16) সরকারি নীতি:

সরকার পরিকল্পিতভাবেও অনেক সময় বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে নতুন নতুন জনপদ বানিয়ে থাকে ফলে সেখানেও জনবসতি বৃদ্ধি পায়।
যেমন- পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণী

17) অনুপ্রবেশ:

পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা প্রভৃতি রাজ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশ ঘটে, ফলে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

  • পরিশেষে বলা যায় উল্লেখিত উপাদান গুলি কখনো এককভাবে কখনো আবার সম্মিলিতভাবে ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *